২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস হত্যাযজ্ঞের দিন। সেই দিন পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহের ফলে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার ভয়াবহ এই ঘটনা নিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ সম্প্রতি তার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন।
ভিডিওর শুরুতেই মইন ইউ আহমেদ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রার্থনা করেন এবং নিহত ও আহতদের মাগফিরাত কামনা করেন। বিদ্রোহের পেছনে কোনো পূর্ব ইঙ্গিত ছিল কি না, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তের সময় তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গির আলাম চৌধুরীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তবে সরকারের সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই তদন্ত সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি।
বিদ্রোহের প্রথম দিন:
সেদিন সকালে মইন ইউ আহমেদ সেনা সদর দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন। সকাল ৯টা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলছিল। তার মাঝে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনহা তার কাছে আসেন এবং বিডিআরের মজুদ কিছু অস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেন। তখন পর্যন্ত বিদ্রোহ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তবে সকাল সাড়ে ৯টায় কর্নেল ফিরোজ পিলখানার গণ্ডগোলের বিষয়ে প্রথম জানাতে আসেন। এরপর মইন ইউ আহমেদ বিদ্রোহ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে থাকেন।
বিদ্রোহের শুরু:
সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে মইন ইউ আহমেদ বিডিআর ডিজি শাকিল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। শাকিল আহমেদ তখন তাকে জানান, দরবার চলাকালীন সময়ে বিদ্রোহ শুরু হয়, যখন কিছু সশস্ত্র সৈনিক দরবার হলে প্রবেশ করে এবং গুলিবর্ষণ শুরু করে।

মইন ইউ আহমেদ জানালেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেডকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি। প্রথম ব্রিগেডটি ১ ঘণ্টার মধ্যে অভিযানের জন্য তৈরি হয়। বিদ্রোহীরা বিডিআরের গেটের সামনে শক্তিশালী অস্ত্র মোতায়েন করে রাখে এবং সেনাবাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়। এতে একজন চালক ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
মিডিয়ার ভূমিকা:
ঘটনার সময়ে গণমাধ্যমের লাইভ কাভারেজ বিদ্রোহ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেন মইন ইউ আহমেদ। তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন শফিক তার নেতৃত্বে ৩৫৫ জন র্যাব সদস্য নিয়ে পিলখানায় পৌঁছান, কিন্তু তারা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাননি। অনুমতি পেলে হয়ত অনেক বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।

বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা:
বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে মইন ইউ আহমেদকে জানানো হয় যে সরকার রাজনৈতিকভাবে বিদ্রোহ সমাধানের চেষ্টা করছে। বিদ্রোহীরা সেনাবাহিনীকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার দাবি করে। মইন ইউ আহমেদ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তাকে জানান, বিদ্রোহীদের কিছু দাবি মানা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিদ্রোহীরা প্রথমত, অফিসারদের হত্যা বন্ধ করতে হবে, দ্বিতীয়ত, আটককৃতদের মুক্তি দিতে হবে, তৃতীয়ত, আত্মসমর্পণ করতে হবে।

বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে বিদ্রোহীদের একটি দল যমুনাতে এসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে। মইন ইউ আহমেদ তাদের জানান, তাদের কোনো দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বিদ্রোহের ঘটনা পরিকল্পিত ছিল এবং এতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মইন ইউ আহমেদ বিদ্রোহের দিনকার ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং জানান, সে সময়ে বিডিআরের মধ্যে যে বিদ্রোহ হয়, সেটি দ্রুত সামাল দিতে সেনাবাহিনী প্রস্তুত ছিল, তবে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে অনেক মূল্যবান প্রাণ হারাতে হয়েছে।
সম্পাদক: রাশেদুল হাসান (রাশেদুল তুষার)
প্রকাশক: শফিউল আজম বাবু
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: ফয়সাল নূরী
মহাব্যবস্থাপক: জাফর উল্লাহ কচি
স্বত্ব © ২০২৫ | মায়ামি সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত