
সিরিয়ায় প্রায় ৫৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আসাদ পরিবারের শাসনের অবসান ঘটেছে বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযানে। মাত্র ১২ দিনের অভিযানে রাজধানী দামেস্কসহ পুরো দেশ বিদ্রোহীদের দখলে চলে গেছে।
পালালেন বাশার আল আসাদ
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ রাজধানী ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর দুই সিনিয়র কর্মকর্তা। একটি ব্যক্তিগত বিমান রাজধানী দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। ধারণা করা হচ্ছে, আসাদ সেই বিমানে ছিলেন।
সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনের অবসানকে “স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত মুহূর্ত” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) এর প্রধান এটিকে “ঐতিহাসিক মুহূর্ত” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিদ্রোহীরা দামেস্ক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কিছুক্ষণ আগে ওপেন সোর্স ফ্লাইট ট্র্যাকাররা সিরিয়ার আকাশসীমায় একটি বিমান উড্ডয়নের রেকর্ড করে।
এতে দেখা যায়, ইলিউশিন ৭৬ বিমানটির ফ্লাইট নম্বর সিরিয়ান এয়ার ৯২১৮। দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে উড়ে যাওয়া শেষ ফ্লাইট ছিল এটি। ওই ব্যক্তিগত উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের পর বিমানবন্দর থেকে সরকারি সেনারা সরে যায়।
ধারণা করা হচ্ছে, দামেস্ক থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ ফ্লাইটে অবস্থান করছিলেন আসাদ। তবে তার গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সোর্স ফ্লাইট ট্র্যাকারদের দাবি, এটি পূর্বদিকে উড়েছিল। তারপরে এটি উত্তরে ঘুরছিল। কয়েক মিনিট পরে, এটি হোমস শহর প্রদক্ষিণ করার সঙ্গে সঙ্গে এর সংকেত অদৃশ্য হয়ে যায়।
২০১১ সালে আরব বসন্তের জের ধরে সিরিয়ার বিক্ষোভ শুরু হয়। ক্রমে তা রুপ নেয় গৃহযুদ্ধে। রাশিয়া আর ইরানের সমর্থনপুষ্ট বাশার আল আসাদ নিজের ক্ষমতা অনেকটা সংহত করে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত আক্রমণ হাতে গত সপ্তাহ থেকে। নতুন লড়াইয়ে একের পর এক বড় বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ হারায় সরকারি বাহিনী।
রোববার বিদ্রোহী দলগুলো টেলিগ্রাম বার্তায় জানায়, ‘বাথ শাসনের অধীনে ৫০ বছরের নিপীড়নের পরে, এবং ১৩ বছরের অপরাধ ও অত্যাচার এবং (জোর করে) বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর… আমরা আজ এই অন্ধকার সময়ের অবসান এবং সিরিয়ার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা ঘোষণা করছি।’
১৯৭০ সালে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক বাহিনীর জেনারেল হাফিজ আল আসাদ সিরিয়ায় ক্ষমতা দখল করেন। তিনি ছিলেন আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টির নেতা। হাফিজ শক্ত হাতে তিন দশকের বেশি সময় সিরিয়া শাসন করেন। তিনি সিরিয়াকে ক্রমেই মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নিতে থাকেন।
হাফিজ নিজের গোত্র আলাওয়াতিদের হাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ এনে দেন। গোটা দেশে নিজের ধ্যান ধারণা আর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা প্রচার করার পাশাপাশি নিজের ক্ষমতাও অনেক বাড়িয়ে নেন। ২০০০ সালে তার মৃত্যু হয়।
এরপর ওই বছরই মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তার কনিষ্ঠ ছেলে বাশার আল-আসাদ। বাশার প্রায় দু যুগ ধরে স্বৈরাচারি কায়দায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। টানা ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে।
বিদ্রোহীদের দখলে সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো
বিদ্রোহীরা এক সপ্তাহের মধ্যে আলেপ্পো, হামা, এবং হোমস দখল করে নেয়। এরপরে দামেস্ক তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। দারা অঞ্চলে বিদ্রোহীদের দখল অনেক আগে থেকেই ছিল। এটি ছিল ২০১১ সালের আসাদবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার।
আকস্মিক এই অভিযানে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি।
হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস): কারা তারা?
- উত্পত্তি: ২০১১ সালে আল-কায়েদার সহযোগী হিসেবে যাত্রা শুরু। তখন নাম ছিল জাবহাত আল-নুসরা।
- পরিবর্তন: ২০১৬ সালে নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাহরির আল-শাম নামে নতুন গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন।
- অবস্থান: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইদলিব প্রদেশে শক্ত ঘাঁটি। সেখানে কার্যত তারা স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকায়।
- লক্ষ্য: আইএসের মতো বৃহত্তর খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে, সিরিয়ায় শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।























