Google search engine

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জেগে ওঠা তরুণেরা

কল্পনার চেয়েও বাস্তব যেন অনেক বেশি চমকপ্রদ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা, যারা সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়ে দেশকে নতুন পথে পরিচালিত করেছেন, তারা এখন দেশের পুনর্গঠনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই তরুণেরা শুধুমাত্র রাজপথে আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নিজেদের উদ্যমে দেশের শহরগুলোকে এক নতুন রূপ দিচ্ছেন।

সাধারণত রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা কাঁচ, প্লাস্টিক, কাগজসহ বিভিন্ন বর্জ্য নিয়ে আমাদের তেমন চিন্তা থাকে না। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি আমরা নাগরিকরাও এই অসচেতনার জন্য দায়ী। কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরা সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তারা শহরের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে, যেন নগরজীবনে এক নবজাগরণের ছোঁয়া নিয়ে আসছেন। ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতিতে রাস্তায় অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকলেও, এই তরুণেরা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে ট্রাফিক সিস্টেমকে সচল রেখেছেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যস্ততম এলাকা চকবাজারে, যেখানে ট্রাফিক পুলিশ থাকা সত্ত্বেও দিনভর যানজট লেগে থাকত, সেখানে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ট্রাফিক সিস্টেম এখন নিয়মের মধ্যে চলে এসেছে। তাদের কাছে নেই কোনো বিশেষ প্রযুক্তি বা দক্ষ জনবল, তবুও তারা সুশৃঙ্খলভাবে সবকিছু পরিচালনা করছেন। এই তরুণেরা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, সমস্যার মূল কারণ প্রযুক্তি বা অন্য কিছু নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সঠিক পরিচালনা ও সচেতনতার অভাব।

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও, তারা হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালকদের থামিয়ে হেলমেট পরার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক করছেন। এ্যাম্বুলেন্স আসার সাথে সাথেই পথ ছেড়ে দিচ্ছেন, এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করলে কাউন্সেলিং করাচ্ছেন। এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা দায়িত্বশীলতার সাথে পালন করছেন না। আমরা যে প্রজন্মকে একসময় শুধুই সামাজিক মাধ্যমে সময় নষ্ট করার জন্য দায়ী করতাম, তারা আজ দায়িত্বশীলতার এমন নজির স্থাপন করছেন যা এককথায় অভূতপূর্ব।

কেন এত পরিশ্রম করছেন জানতে চাইলে তানজির নামক এক শিক্ষার্থী বলেন, “এই দেশ তো আমাদেরই। অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশটা মুক্ত হয়েছে। এখন দেশের জন্য কিছু করা আমাদেরই দায়িত্ব। আমরাই যদি এই দায়িত্ব না নিই, তাহলে চারপাশ অগোছালো হয়ে যাবে।”

রাশেদ নামের আরেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, এক হেলমেটবিহীন বাইক চালককে থামিয়ে হেলমেট পরিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমে চালক অসম্মতি জানালেও, রাশেদ তাকে বোঝান, “ভাই, এটা তো আপনার সেফটির জন্যই বলছি।”

চকবাজারের চক মালঞ্চে আরেকটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। এখানে একদল তরুণ পড়ে থাকা ওয়ান টাইম চায়ের কাপ, সিগারেটের খোসা, কাগজসহ অন্যান্য ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। নিজ উদ্যোগে ময়লার ঝুড়ি কিনে তারা সেখানে ময়লা ফেলার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই উদ্দীপনামূলক কর্মযজ্ঞ দেখে আশপাশের মানুষও যত্রতত্র ময়লা ফেলতে লজ্জিত হচ্ছে। এর চেয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্য আর কি হতে পারে?এমন স্বপ্নের বাংলাদেশই তো আমরা চেয়েছিলাম। শাহরিয়ার, ওমর, তুষার, আনানের মতো তরুণেরা যেন সচেতনতার অভাবের কারণে দেশের বিকাশের বাধাগুলো নতুন করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, নগরের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার ও বাজে দেওয়াল লিখনের পরিবর্তে কিছু শিক্ষার্থী দেয়ালগুলোকে মনোমুগ্ধকর কারুকার্যে সাজিয়ে তুলছেন। রাতের বেলায় ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে কোনো হামলা যাতে না হয়, সেই জন্য রাত জেগে পাহারায় থাকছেন একদল তরুণ। এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে তারা যেমন সফল হচ্ছেন, আমাদের বড়রাও কেন পারবেন না? এই তরুণেরা আমাদের জন্য যেন এক নতুন আলোর দিশারি, যারা আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছেন।

নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই আন্দোলন তরুণদের হাত ধরে শুরু হয়েছে, কিন্তু তা থেমে যাবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি তাদের মতো দায়িত্ববান হয়ে ওঠেন, তবে আমরা সবাই মিলে সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

More articles

Latest