Google search engine

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনন্য নক্ষত্র: সাকিব আল হাসান

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সাকিব আল হাসান এমন এক নাম, যার তুলনা নেই। সাকিব শুধু দেশের সেরা খেলোয়াড়ই নন, তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবেও স্বীকৃত। তাঁর ব্যাটিংয়ের আক্রমণাত্মক ধরন এবং বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতা তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিভিন্ন ফরম্যাটে দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির অলরাউন্ডার র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা সাকিব আল হাসান তাঁর অসাধারণ প্রতিভা এবং ক্রীড়ানৈপুণ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন।

Shakib Al Hasan was the Player of the Match, Oman vs Bangladesh, T20 World Cup, Muscat, October 19, 2021
ছবি: আইসিসি’র ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত

সাকিবের সাফল্যের সূচনা

২০০৮ সালে, চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব তাঁর সপ্তম টেস্টে ৭১ রান এবং ৭ উইকেট নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। এই পারফম্যান্সের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় বোলার হিসেবে এক ইনিংসে এতগুলো উইকেট নেন। পরের বছর, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁর প্রথম টেস্ট অধিনায়কত্বের ম্যাচে সাকিব ৮ উইকেট নেন এবং চতুর্থ ইনিংসে ৯৬ রান করে দলকে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ দেন। এর কিছুদিন পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যামিলটনে তিনি তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন।

Shakib Al Hasan is all smiles with the match ball after picking up his career-best figures, Bangladesh v New Zealand, 1st Test, Chittagong, 3rd day, October 19, 2008
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক ইনিংসে একাই ৭ উইকেট নিয়ে চমকে দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকে (ছবি: এএফপি)

সব ফরম্যাটের অধিনায়ক

২০০৯ সালে মাশরাফি বিন মর্তুজার ইনজুরির পর সাকিবকে বাংলাদেশের সব ফরম্যাটের অধিনায়ক করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ৪৭টি ওডিআই ম্যাচের মধ্যে ২২টি জয়লাভ করে, যার মধ্যে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানো ছিল উল্লেখযোগ্য। সাকিবের অধিনায়কত্বে দল নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়, তবে তাঁর ব্যাক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল সবসময়েই প্রশংসার দাবিদার।

Shakib Al Hasan was all smiles at the captains' event, World Cup 2023, Ahmedabad, October 4, 2023
(ছবি: গেটি ইমেজেস)

সাকিবের উল্লেখযোগ্য রেকর্ডসমূহ

সাকিব আল হাসান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেসব অসাধারণ রেকর্ড গড়েছেন, তার কিছু নিম্নরূপ:

  • সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট অধিনায়কত্ব (৬ষ্ঠ): ২২ বছর ১১৫ দিন
  • এক ইনিংসে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট: ২০১১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মিরপুরে ১৪৪ রান এবং ৬ উইকেট
  • এক টেস্টে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট: ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খুলনায় ১৩৭ রান এবং উভয় ইনিংসে ৫টি করে উইকেট
  • টেস্ট ইতিহাসে পঞ্চম উইকেটে সর্বোচ্চ পার্টনারশিপ: নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটনে (২০১৭) সাকিব ও মুশফিকুর রহিমের ৩৫৯ রান

    Shakib Al Hasan registered his first double-century in Test cricket, New Zealand v Bangladesh, 1st Test, Wellington, 2nd day, January 13, 2017
    ২০১৭ সালে ওয়েলিংটনে নিজের প্রথম দ্বি-শতক (২১৭ রান) করার পথে মুশফিকুর রহিমের সাথে রেকর্ড ৩৫৯ রানের পার্টনারশিপ করেন সাকিব (ছবি: এএফপি)
  • ওডিআইতে ৭ বার ‘প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ’ পুরস্কার: হাশিম আমলা (দক্ষিণ আফ্রিকা), ভিভ রিচার্ডস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), যুবরাজ সিং (ভারত), সৌরভ গাঙ্গুলি (ভারত), রিকি পন্টিং (অস্ট্রেলিয়া) এবং এমএস ধোনির সঙ্গে যৌথভাবে।
  • এক মাঠে ৩য় সর্বাধিক রান: মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ২৬৫৬ রান (তামিম ইকবাল ২৮৯৭ রান এবং মুশফিকুর রহিম ২৬৮৪ রান নিয়ে যথাক্রমে ১ম ও ২য় স্থানে আছেন)।
  • ওয়ানডে ক্রিকেটে এক মাঠে সর্বাধিক উইকেট: মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ১৩১ উইকেট (বিশ্বরেকর্ড)। এই মাঠে ৩ ফরম্যাট মিলে সাকিবের মোট উইকেট ২৫২; যা একক কোন মাঠে কোন প্লেয়ারের সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস এবং মুরালিধরণের মতো গ্রেট ক্রিকেটারদের পিছনে ফেলে এই রেকর্ড করেছেন সাকিব।
  • ওডিআইতে ৯ম দ্রুততম ৩০০ উইকেট
  • এক ইনিংসে পঞ্চাশ ও পাঁচ উইকেট: ২০১৯ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ৫১ রান এবং ৫ উইকেট
  • ওডিআইতে ১০০০ রান, ৫০ উইকেট এবং ৫০ ক্যাচ: মোট ৭৫৭০ রান, ৩১৭ উইকেট এবং ৬০ ক্যাচ
  • টিএ২০ ক্রিকেটে দীর্ঘতম ক্যারিয়ার: ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জুন অব্ধি ১৭ বছর ২০৯ দিনের ক্যারিয়ার

২০১৯ বিশ্বকাপের নায়ক

২০১৯ সালের আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে সাকিব নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করেন কেন তিনি এত বড় খেলোয়াড়। তিনি গ্রুপ পর্বে ৬০৬ রান করে শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড ভেঙে দেন এবং পুরো টুর্নামেন্টে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। সেইসঙ্গে ১১টি উইকেট নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

Shakib, the MVP of the 2019 World Cup | ESPNcricinfo.com
২০১৯ সালে স্বরণীয় এক বিশ্বকাপ খেলেন সাকিব আল হাসান

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সাফল্য

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও সাকিবের উপস্থিতি ছিল সমানভাবে উজ্জ্বল। ২০১১ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে দলে ভেড়ায়, এবং ২০১২ ও ২০১৪ সালে দলের আইপিএল শিরোপা জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। সিপিএল, বিপিএলসহ বিভিন্ন ঘরোয়া লিগেও সাকিব অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। বিপিএলে তো তিনি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন।

ভবিষ্যত অনুপ্রেরণা

সাকিব আল হাসানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এই সময়ে তিনি ১৪,০০০-এরও বেশি রান এবং ৭০০-এরও বেশি উইকেট নিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে তাঁর প্রভাব এতটাই গভীর যে, তাঁর পরিসংখ্যান এবং কৃতিত্ব বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতেও এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Shakib Al Hasan bowled dot balls consistently, Sri Lanka vs Bangladesh, Asia Cup, Pallekele, August 31, 2023
(ছবি: গেটি ইমেজেস)

সাকিবের রেকর্ড এবং সাফল্য নিয়ে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তিনি শুধু বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটারই নন, তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এক বিরল প্রতিভা। তাঁর অধিনায়কত্ব, অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এবং অতুলনীয় দৃঢ়তা তাঁকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরস্থায়ী নায়ক হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

More articles

Latest