
আমরা থাকি কানাডায়। কিন্তু আমাদের চিন্তা চেতনার একটা বড় অংশ দখল করে আছে বাংলাদেশ। আমরা বাংলাদেশী ক্যানেডিয়ান। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি যার মাটি ও মানুষ, ভাষা ও সাহিত্য, এবং শিল্প ও সংস্কৃতির সাথে আমাদের আছে শেকড়ের সংযোগ। স্বদেশের সেই ঐতিহ্যকে অন্তরে ধারণ করে “ডায়াস্পোরিক” সমাজে অভিবাসীরা একদিকে যেমন গোষ্ঠীগতভাবে নানান সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে, অন্যদিকে তেমনি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশেও মিলিত হয়। কথা আছে “Distance is a great promoter of love”, আর তাই হাজার হাজার মাইল দূরে পৃথিবীর অপর প্রান্তে থেকেও মাতৃভূমির অর্জনে অভিবাসী জনগোষ্ঠি উল্লসিত হয়, আবার তারা উৎকণ্ঠায় থাকে দেশ যখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে ।তবে “ডায়াস্পোরিক” সমাজে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ এবং মুক্ত আলোচনার প্ল্যাটফর্ম খুব একটা চোখে পড়ে না। সম্প্রতি “বাংলা টেলিভিশন কানাডা” এবং “বাংলা ২৪ কানাডা”র যৌথ উদ্যোগে টরন্টোর আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত হলো “প্রবাস ভাবনায় সাম্প্রতিক বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি মুক্ত সেমিনার। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে এমন উন্মুক্ত আলোচনার ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান আয়োজনের পথিকৃৎ হিসেবে “বাংলা টেলিভিশন কানাডা এবং “বাংলা ২৪ কানাডা” নিঃসন্দেহে ধন্যবাদার্হ।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে থেকেই অডিটোরিয়াম ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। প্রথমেই বাংলা টেলিভিশন কানাডার প্রযোজিত “৪৭ থেকে ৭১” শিরোনামের ডকুমেন্টরি প্রদশর্নীর মাধ্যমে দেশের স্বার্থে প্রাণ উৎসর্গ করে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এর পরেই বাংলা টেলিভিশন কানাডার কর্ণধার সাজ্জাদ আলীর শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এখানে বলে রাখা ভালো সেমিনার অনুষ্ঠানের উপর কোন অনুপুঙ্খ আলোচনা এটি নয়। শুধু একজন উপস্থিত দর্শক হিসেবে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাই এখানে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধকার স্নেহাশিস রায়। তিনি বাংলাদেশের উদ্ভব থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি “ইনক্লুসিভ” বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। লেখকের পক্ষে প্রবন্ধটি পাঠ করে শোনান অনুষ্ঠান উপস্থাপিকা মানজুমান আরা। পঠিত প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন তিন জন পূর্ব-নির্ধারিত আলোচক —যথাক্রমে টিটো খন্দকার, আমিনুর রহমান সোহেল ও শওগাত আলী সাগর। আলোচকরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব অবস্থান থেকে তাঁদের বিশ্লেষণধর্মী মতামত উপস্থিত দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
সেমিনারে দর্শকরা শুধু যে শুনতে যান তা’ নয়। তাঁরা চান তাঁদের ভিন্ন অভিমত, যদি কিছু থাকে, তা প্রকাশ করতে কিংবা উপস্থাপিত ভাবনা-কেন্দ্রিক তাঁদের কোন যৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর পেতে। তাই সেমিনার নিঃশ্চয়ই অসম্পূৰ্ণ থাকতো যদি আলোচকদের বাইরে উপস্থিত দর্শকদের অভিমত প্রকাশের কিংবা প্রশ্ন করার কোন সুযোগ না থাকতো। সে চিন্তা মাথায় রেখে আয়োজকরা প্রত্যেক আলোচকের বক্তব্যের পর পরই নির্ধারিত রেখেছেন একটি স্বতন্ত্র প্রশ্নোত্তরপর্ব।
সাজ্জাদ আলী এ কথা পরিস্কার করে বলেছেন আয়োজকদের তরফ থেকে প্রবন্ধকার, আলোচকবৃন্দ এবং উপস্থিত প্রশ্নকর্তাদের কারো জন্যেই স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন অলিখিত অনুশাসন আরোপিত ছিলো না। ফলে প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে তাঁদের অভিমত তুলে ধরতে পেরেছেন। প্রশ্নোত্তর-পর্বটি সঞ্চালনা করেন সাজ্জাদ আলী। সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে অধিক সংখ্যক প্রশ্নকর্তাদের জন্যে সুযোগ সৃষ্টির প্রয়াসে তিনি দর্শকদের প্রাসঙ্গিক এবং সরাসরি প্রশ্ন করার অনুরোধ জানান।
কৌতূহলী দর্শকদের অনেকেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রশ্ন করেন। প্রায় সব প্রশ্নই ছিল প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। প্রবন্ধকার এবং আলোচকরা নিজেদের অবস্থান, অনুভব ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করেন। ফলে খুবই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের এ পর্বটি। সব মিলিয়ে সেমিনারটি খুবই দর্শকনন্দিত হয়েছিলো একথা বললে কোন অত্যুক্তি হবেনা। দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এখানে উল্লেখ্য, আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে এই অনুষ্ঠানে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা। একটি পূর্ব-নির্ধারিত জরুরি প্রয়োজনে অনুষ্ঠান শেষের কিছু আগে তাকে চলে যেতে হয়েছিলো। যাওয়ার আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “এমন চমৎকার অনুষ্ঠান ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না। কিন্ত বন্ধু, তবু আমাকে যেতে হবে একটি জরুরি প্রয়োজনে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ এমন এক সুন্দর এবং সময়োচিত অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে।”
আরো মনে পড়ে অনুষ্ঠানের শেষের দিকে আর একজন দর্শক দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল সমাজে আমাদের আর কোন প্রয়োজন নেই। সবকিছুই কেমন যেন বদলে গেছে। কিন্তু আজ এ সেমিনারে এসে আবার নতুন করে অনুভব করছি, না, আমাদের দিন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নতুন করে আবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।”
একটু পরেই দর্শক-সারি থেকে অন্য এক জন তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন এভাবে “জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে কেন যেন মনে হচ্ছিল আমাদের মধ্যে একটা অমূলক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমরা একে অন্যের সামনে দাঁড়াতে পারতামনা। একে অন্যের মুখ দেখতে পারতাম না। আজ এ সেমিনার আমাদেরকে একই মঞ্চে এনেছে। আমরা একে অন্যের মুখোমুখি হয়েছি। এ সেমিনার আমাদের সেই দূরত্ব অতিক্রম করার সুযোগ করে দিয়েছে।”
স্বস্তির বিষয় সেমিনারে সবাই মন খুলে কথা বলতে পেরেছেন। প্রবন্ধকার স্বচ্ছন্দে তাঁর সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন, আলোচনায় এবং প্রশ্নোত্তরপর্বে আলোচকরা স্বাধীনভাবে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, আর অনুসন্ধিৎসু দর্শক-শ্রোতারা আপন মনের তাগিদে তাঁদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন প্রবন্ধকার এবং আলোচককদের উদ্দেশ্যে। ফলে প্রবন্ধকার, আলোচক, দর্শক-শ্রোতা এবং আয়োজকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সাড়ে তিন ঘন্টার এই সেমিনারটি খুবই প্রাণবন্ত ছিল। অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে হলের প্রজেক্টরের বিশাল স্ক্রিণে বাংলাদেশ-কানাডার জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে যখন দুইদেশের পতাকা উড়ছিলো তখন হলের ভেতর আমার মতো অনেকেরই চোখ কিছুটা হলেও আর্দ্র হয়ে এসেছিলো।
সবশেষে আয়োজকদের আরো একবার ধন্যবাদ জানাই মন খুলে কথা বলে মন-ভালো-করা একটা সেমিনার উপহার দেয়ার জন্যে। আমন্ত্রিত অতিথিরা কিছু না খেয়ে গেলে গেরস্থের অমঙ্গল হতে পারে ভেবে বাংলা টেলিভিশন কানাডার আয়োজকরা বরাবরের মতো কিছু জল-পানের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তার জন্যে তাঁদের বাড়তি সাধুবাদ জানাই।
লেখক: অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জর্জ ব্রাউন কলেজ, টরন্টো, অন্টারিও, কানাডা























