Google search engine

ধ্বংসস্তূপে চলছে মরদেহ উদ্ধারের কাজ

মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহত ছাড়ালো হাজার

মিয়ানমারে শক্তিশালী ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা শনিবার এক হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের কাছে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে অসংখ্য ভবন ধসে পড়লে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধার করেন।

দেশটির সামরিক নেতৃত্বাধীন সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১,০০২ জন নিহত হয়েছেন এবং ২,৩৭৬ জন আহত হয়েছেন, পাশাপাশি ৩০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “বিস্তারিত তথ্য এখনও সংগ্রহ করা হচ্ছে,” যার অর্থ মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মিয়ানমার বর্তমানে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে, যা দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে ত্রাণ তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুক্রবার দুপুরে ভূমিকম্পটি মিয়ানমারের মান্দালয়ের কাছে আঘাত হানে, এরপর একাধিক শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটি ছিল ৬.৪ মাত্রার। ভূমিকম্পে বহু ভবন ধসে পড়ে, রাস্তা ফেটে যায়, সেতু ভেঙে পড়ে এবং একটি বাঁধ ধসে যায়।

রাজধানী নেপিডোতে শনিবারও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো সংস্কারের কাজ চলছিল, তবে বিদ্যুৎ, টেলিফোন এবং ইন্টারনেট সেবা এখনও বন্ধ রয়েছে। বহু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ইউনিট ভূমিকম্পে ধসে পড়লেও ওই এলাকা শনিবারও কর্তৃপক্ষ অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

থাইল্যান্ডেও ভূমিকম্পের তীব্র প্রভাব

প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও ভূমিকম্পের প্রভাব দেখা গেছে। রাজধানী ব্যাংককসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়। ব্যাংকক নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ছয়জন নিহত, ২৬ জন আহত এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছে।

রাজধানীর জনপ্রিয় চাতুচাক মার্কেটের কাছে একটি নির্মাণাধীন ৩৩-তলা উঁচু ভবন ভূমিকম্পের সময় কেঁপে উঠে এবং ধুলোর বিশাল মেঘ সৃষ্টি করে ভেঙে পড়ে।

শনিবার ভারী যন্ত্রপাতি এনে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করা হলেও নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।

৪৫ বছর বয়সী নারুয়েমল থংলেক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি প্রার্থনা করছিলাম তারা বেঁচে আছে, কিন্তু যখন এখানে এসে ধ্বংসস্তূপ দেখলাম, তখন মনে হলো তারা কোথায়? কোন কোণে লুকিয়ে আছে? আমি এখনও প্রার্থনা করছি যে তারা সবাই বেঁচে থাকুক।”

ভূমিকম্পের কারণ: সক্রিয় ভূকম্পীয় প্লেট

মিয়ানমার এমনিতেই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। দেশটি সাগাইং ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যা ভারতীয় প্লেট এবং সুন্ডা প্লেটকে পৃথক করেছে।

ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভের সিসমোলজিস্ট ব্রায়ান ব্যাপটি জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফল্ট লাইনে মাত্র এক মিনিটের বেশি সময় ধরে ৫ মিটার পর্যন্ত সঞ্চালন ঘটে, যার ফলে ব্যাপক কম্পন সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, “যখন একটি বড় ভূমিকম্প জনবহুল এলাকায় ঘটে, যেখানে দুর্বল কাঠামোর ভবন রয়েছে, তখন এর পরিণতি ভয়াবহ হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখানেও তেমনটাই ঘটেছে।”

ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে বিভিন্ন দেশ

মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে রক্তের চাহিদা বেড়েছে। সাধারণত দেশটি বিদেশি সাহায্য গ্রহণে অনাগ্রহী হলেও, এই দুর্যোগের পর সরকার জানিয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে প্রস্তুত।

দেশটির জান্তা সরকার ২০২১ সালে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের পর থেকে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। সরকারি বাহিনী দেশটির অনেক এলাকা হারিয়েছে, যা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের জন্য চরম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

চীন ও রাশিয়া, যারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, তারাই প্রথম দেশ হিসেবে সাহায্য পাঠিয়েছে।

চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে ৩৭ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল ড্রোন ও ভূকম্প পর্যবেক্ষণ যন্ত্রসহ শনিবার সকালে ইয়াঙ্গুন পৌঁছেছে।

রাশিয়ার জরুরি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা দুটি বিমানে ১২০ জন উদ্ধারকারী ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে।

এছাড়া, ভারত একটি উদ্ধারকারী ও মেডিকেল দল পাঠিয়েছে, মালয়েশিয়া ৫০ সদস্যের একটি দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ২ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেবে।

জাতিসংঘও ত্রাণ সহায়তার জন্য প্রাথমিকভাবে ৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

More articles

Latest