Google search engine

যুক্তরাজ্য না যুক্তরাষ্ট্র: কোন দেশে প্রবাসীদের জন্য সুবিধা বেশি?

বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নত জীবনমান, মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আশায় অনেক বাংলাদেশিই বিদেশে পাড়ি জমান। উচ্চশিক্ষা, পেশাগত অগ্রগতি কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্য নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমানো এসব মানুষদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোন দেশটি তাদের জন্য উপযুক্ত? বিশেষ করে যুক্তরাজ্য (UK) ও যুক্তরাষ্ট্র (USA) দুটো দেশেই রয়েছে বাংলাদেশিদের বড় একটি প্রবাসী জনগোষ্ঠী। তবে নাগরিকত্ব, স্থায়ী বসবাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান—সবদিক বিবেচনায় কোন দেশটি বেশি সহায়ক? এ নিয়ে তুলনামূলক একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।

প্রথমেই দেখা যাক নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া ও সময়সীমা। যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের জন্য প্রথমে গ্রিন কার্ড বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি পেতে হয়, যা সাধারণত কাজ, পরিবার কিংবা আশ্রয় প্রার্থনার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। গ্রিন কার্ড পাওয়ার পাঁচ বছর পর নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। যদি কারও স্বামী বা স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন, তাহলে মাত্র তিন বছর পরই এই আবেদন করা সম্ভব হয়। তবে আবেদনকারীদের অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞান এবং “Good Moral Character”-এর প্রমাণ দিতে হয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে Indefinite Leave to Remain (ILR) পাওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হলে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। ILR পাওয়ার সময়সীমা সাধারণত পাঁচ বছর, তবে তা নির্ভর করে ব্যক্তির ভিসার ধরণ ও বসবাসের অবস্থা অনুযায়ী। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের নাগরিক অথবা ব্রিটিশ নাগরিকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ILR পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দ্রুত হয়। নাগরিকত্ব পেতে হলে “Life in the UK” নামক একটি পরীক্ষা পাস করতে হয় এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়।

নাগরিকত্ব না পেলেও উভয় দেশে রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডধারীরা স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার পূর্ণ অধিকার পান। তারা সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security) এবং কখনো কখনো মেডিকেইড (Medicaid) এর মতো স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। তাদের সন্তানরা পাবলিক স্কুলে পড়তে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে কম খরচে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এ ছাড়া গ্রিন কার্ডধারীরা ব্যবসা শুরু করতেও স্বাধীন। তবে নাগরিকত্ব না থাকলে তারা ভোটাধিকার এবং কিছু সরকারি পদে চাকরির সুযোগ পান না।

যুক্তরাজ্যে ILR কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ওয়ার্ক পারমিটধারীরাও নানা সুবিধা ভোগ করেন। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে—এনএইচএস (NHS) এর অধীনে তারা বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকেন। সন্তানদের জন্য সরকারি স্কুলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়। ILR থাকলে তারা কিছু সরকারি সহায়তা যেমন চাইল্ড বেনিফিট, ইউনিভার্সাল ক্রেডিট ইত্যাদি পাওয়ার যোগ্য হন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণেও কিছুটা সহজতা থাকে। তবে ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক অধিকার নাগরিকত্ব ছাড়া পাওয়া যায় না।

কর্মসংস্থানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ফাইন্যান্স ও গবেষণা খাতে উচ্চবেতন ও উন্নতির ভালো সুযোগ দেয়। তবে সেখানে ওয়ার্ক ভিসা প্রক্রিয়া কঠিন এবং একটি চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে গেলে ভিসার বৈধতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিপরীতে, যুক্তরাজ্যে পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক সহজ। সেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের সফলতা চোখে পড়ার মতো এবং কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য থাকায় ক্যারিয়ার অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

সামাজিক নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য কিছুটা এগিয়ে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকবান্ধব ও সুশৃঙ্খল। NHS-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কারণে স্বাস্থ্যসেবার খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং মান উন্নত। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সুযোগ বেশি হলেও স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বেসরকারিভিত্তিক এবং খরচ অনেক বেশি। এছাড়া সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো অনেক সময় প্রবাসীদের চিন্তিত করে তোলে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য রয়েছে সম্ভাবনার দ্বার। তবে যাদের লক্ষ্য দ্রুত নাগরিকত্ব, নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ এবং বিনামূল্যে শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা, তাদের জন্য যুক্তরাজ্য হতে পারে ভালো গন্তব্য। আর যারা উচ্চ আয়ের পেশা, ব্যবসার প্রসার এবং বৈচিত্র্যময় সুযোগ খুঁজছেন, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র হতে পারে সঠিক সিদ্ধান্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

More articles

Latest