
বাংলাদেশে সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রোববার (০৪ আগস্ট) শুরু হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগের প্রথম দিনে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে সারাদেশে অন্তত ৬৬ জন মারা গেছেন। রাজধানীর শাহবাগ ও সাইন্সল্যাবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বিক্ষোভে উত্তাল আফতাবনগর, উত্তরা, ধানমণ্ডি ও জাতীয় প্রেস ক্লাব। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৬৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ঢাকায় ৪ জন নিহত
সাইন্সল্যাবে ১ জনসহ ঢাকায় মোট ৪ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে সাইন্সল্যাব এলাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সকাল ১১টার দিকে বাটা সিগন্যালের দিক থেকে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের একটি মিছিল সাইন্সল্যাবের দিকে আসতে থাকে এবং আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আন্দোলনকারীরা পাল্টা ধাওয়া দিলে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সেখান থেকে পিছু হটে।

মুন্সীগঞ্জে নিহত ৪
মুন্সীগঞ্জে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে ৪ জন নিহত হন এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ একজনকে ঢাকায় আনার পথে সিরাজখানে মৃত্যু হয়। আজ রোববার সকাল পৌনে ১০টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় এই সংঘর্ষ ঘটে।
নিহতদের বয়স ২২-২৫ বছরের মধ্যে। আহতদের অধিকাংশের বয়স ২০-২৫ বছরের মধ্যে। দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবু হেনা জামাল জানান, সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়, যাদের মধ্যে দুজন মৃত ছিলেন। তাদের বয়স ২২-২৫ বছর। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মাগুরায় নিহত ৪
মাগুরায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বী নিহত হয়েছেন। এ সময় সংঘর্ষে ৪ পুলিশ সদস্যসহ আহত হয়েছেন ১০ জন। রোববার (৪ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, সকালে পারনান্দুয়ালী এলাকা থেকে বিএনপি একটি মিছিল নিয়ে শহরে ঢুকতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয় এবং রাবার বুলেট ও গুলি নিক্ষেপ করে। এ সময় নিহত হন রাব্বী।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, রাব্বী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, তার বুকে গুলি লেগেছে। সংঘর্ষে তিন পুলিশ সদস্যসহ ১০ জন আহত হন। এছাড়া, চবি শিক্ষার্থী ফরহাদ ও কলেজ শিক্ষার্থী সুমন নামের একজন ছাত্রলীগের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রংপুরে নিহত ৫
রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ জন আহত হয়েছেন।
বগুড়ায় ৩ জন নিহত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচিতে বগুড়ায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। বগুড়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করে রেখেছে হাজারো বিক্ষোভকারী। শহরের বিভিন্ন মোড়ে রাস্তায় আগুন জ্বালিয়েছে তারা।
দুপচাঁচিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শামসুন্নাহার বলেন, ১২ জন চিকিৎসা নিতে দুপচাঁচিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে যান। তাদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। মাথায় গুলি লেগে নিহত হওয়া ব্যক্তির নাম মনিরুল ইসলাম (২৪)।
অন্যদিকে, আহত চারজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদেরকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ জানান, সেখানে একজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয়।
পাবনায় নিহত ৩
পাবনার খেয়াঘাট মোড়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মিছিল থেকে গুলি চালানো হলে ৩ জন নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা এই গুলি চালান। বিক্ষোভকারীরা এরপর তার গাড়ি পুড়িয়ে দেন। এই ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন পাবনা সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক।
এছাড়া লক্ষ্মীপুরে সংঘর্ষে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০ জন। আরো নিহত হয়েছেন সিরাজগঞ্জে ৯ জন, বরিশালে ২ জন, জয়পুরহাটে ১ জন, কুমিল্লায় ২ জন, কিশোরগঞ্জে ৪ জন, ভোলায় ৩ জন, ফেনিতে ৭ জন এবং ধামরাইতে ১ জন। এছাড়া আনফিশিয়ালি আরো কিছু মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে।
সিরাজগঞ্জে থানায় অগ্নিসংযোগ, ১১ পুলিশ নিহত
সরকারের পতনের দাবিতে ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনের সময় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ১১ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। রোববার সন্ধ্যায় রাজশাহী রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, এনায়েতপুর থানা বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে এবং পুলিশ সদস্যরা থানা প্রবেশ করতে পারছে না। গাছ দিয়ে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আজ রোববার থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশে অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ।
এর আগে, সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে এই ঘোষণা দেয়া হয়। এই সমাবেশেই অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।























