
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। এবার থেকে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প জনগণের মতামত ছাড়া অনুমোদন করা হবে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক আদেশ অনুযায়ী, যেকোনো প্রকল্প প্রস্তাব সর্বপ্রথম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে জনগণের মতামত সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেই মতামতের ভিত্তিতে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হবে পরিকল্পনা কমিশনে। এই পদক্ষেপটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নেতিবাচক মতামত মানেই বাতিল!
নতুন আদেশ অনুসারে, যদি কোনো প্রকল্পে জনগণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসে, তবে সেই প্রকল্প অনুমোদন নাও পেতে পারে। এতদিন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো নিজস্ব প্রস্তাবনা তৈরি করে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাত। কিন্তু এখন থেকে জনগণের মতামত গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প যাচাই-বাছাই করা হবে।
প্রকল্পের তথ্য জানাতে হবে জনগণকে
প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পর জনগণকে জানাতে হবে প্রকল্পের মূল তথ্য, যেমন খরচ, মেয়াদ, উদ্দেশ্য, সম্ভাব্যতা যাচাই, এলাকা, আর্থিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব ইত্যাদি। এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে একটি কমেন্ট বক্স তৈরি হবে, যেখানে জনগণ দুই সপ্তাহ ধরে তাদের মতামত দিতে পারবে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দিক থেকে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে শুধু ওয়েবসাইটে তথ্য দিলে চলবে না; সাধারণ জনগণ যাতে সহজভাবে প্রকল্পের তথ্য বুঝতে পারে, সেভাবে প্রকাশ করতে হবে।” জনসম্পৃক্ততাহীন প্রকল্পের উদাহরণ হিসেবে তিনি কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের প্রকল্প উল্লেখ করেন, যা স্থানীয় জনগণ ও অংশীজনদের না জানিয়ে নেওয়া হয়েছিল। জনমতের মাধ্যমে এমন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারের কড়া মনোভাবও এই নতুন প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কিছু প্রকল্প পর্যালোচনা করছে, যেগুলোর খরচ বেশি দেখানো হয়েছে বা স্থানীয় জনগণের জন্য তেমন গুরুত্ব বহন করে না। এ তালিকায় রয়েছে ফরিদপুর-কুয়াকাটা মহাসড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প এবং চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ১০০টিরও বেশি প্রকল্প স্থগিত বা বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের উপর ‘লাগাম’
বর্তমান ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫২টি হলেও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেওয়ার মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের অপচয় রোধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে কিছু মন্ত্রণালয়ের ১৩টি প্রকল্প প্রস্তাব ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ উদ্যোগের ফলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী।
সূত্র: প্রথম আলো























