
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা রবিন খুদা তার পরিবারিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ইউনিভার্সিটি অফ সিডনিকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অনুদান এবং নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) রাজ্যের সবচেয়ে বড় একক অনুদান। এই অনুদান ওয়েস্টার্ন সিডনির মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার এবং তাদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে সহায়তা করার জন্য ব্যয় করা হবে।
২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি
রবিন খুদার ‘খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন STEM প্রোগ্রাম’ মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হবে, যার লক্ষ্য নারীদের STEM শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।
আউটরিচ প্রোগ্রাম (৭ম থেকে ১০ম শ্রেণি)
- ওয়েস্টার্ন সিডনির স্কুলগুলোতে বিজ্ঞান, গণিত ও প্রকৌশল সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
- প্রথম ধাপে ছয়টি স্কুলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা পর্যায়ক্রমে ৪০,০০০ শিক্ষার্থীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনবে।
খুদা একাডেমি (১১ম ও ১২ম শ্রেণি)
- STEM বিষয়ে অধ্যয়নরত মেয়েদের জন্য একাডেমিক সহায়তা ও বার্ষিক অনুদান দেওয়া হবে।
- সিডনি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের দ্বারা মেন্টরশিপ ও টিউটরিং সুবিধা প্রদান করা হবে।
- একাডেমির পুরো কার্যক্রম চালু হলে ১,২০০ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে।
খুদা স্কলার্স
- উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জন করা ছাত্রীদের সরাসরি ইউনিভার্সিটি অফ সিডনিতে STEM বিষয়ে ভর্তি ও বৃত্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
- এদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও আবাসন সুবিধাও প্রদান করা হবে।
- কর্মসূচির আওতায় ৩০০ জন নারী শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নারী STEM বিনিয়োগ প্রকল্প, যা নারীদের জন্য ক্যারিয়ারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে।

STEM শিক্ষায় বৈষম্য দূর করার লক্ষ্য
রবিন খুদা বলেন,
“STEM শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি। আমার লক্ষ্য এই কর্মসূচির মাধ্যমে একটি সফল মডেল তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে অন্যরাও অনুসরণ করতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যখন AirTrunk প্রতিষ্ঠা করি, তখন দেখি প্রযুক্তিগত ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় নারীর সংখ্যা খুবই কম। আমি চাই STEM-এ নারীদের আরও অংশগ্রহণ বাড়ুক এবং এই কর্মসূচির মাধ্যমে তা সম্ভব হবে।”

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মার্ক স্কট বলেছেন,
“খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের এই অনুদান শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এটি শুধু ওয়েস্টার্ন সিডনির মেয়েদের জন্য নয়, বরং পুরো STEM ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের অবস্থান দৃঢ় করবে।”
তিনি আরও বলেন, “ইউনিভার্সিটি অফ সিডনিটি ১৭৫ বছর ধরে ন্যায়সঙ্গত শিক্ষার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। এই অনুদানের ফলে নারী শিক্ষার্থীদের STEM শিক্ষায় অংশগ্রহণের পথ আরও সুগম হবে।”
ওয়েস্টার্ন সিডনিতে রবিন খুদার শিকড়
রবিন খুদা ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন এবং প্রথম বসবাস শুরু করেন ওয়েস্টার্ন সিডনিতে। পরবর্তীতে, তিনি ২০১৭ সালে সেখানে AirTrunk নামে ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্যতম বৃহত্তম ডেটা কোম্পানিতে পরিণত হয়।
২০২৩ সালে, তিনি ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় (১২ বিলিয়ন ডলার) তার কোম্পানি বিক্রি করেন এবং এর থেকে ২৬২ কোটি টাকা কর্মীদের উপহার দেন। এই ঘটনা তখন অস্ট্রেলিয়াজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
খুদা তার নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা দক্ষতা এবং প্রভাবের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। ২০২৪ সালে, তিনি অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ (AFR) এর শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করে যৌথভাবে বছরের সেরা ব্যবসায়ী নির্বাচিত হন এবং টেক ক্যাপিটাল এপ্যাক ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ডস-এ এপ্যাক ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিডার অ্যাওয়ার্ড জয় করেন।
নারীদের STEM-এ অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, আনন্দিকা রামেশ (সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও কমার্সে অনার্স করছেন) বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কোডিং ক্লাসে এখনো নারীরা সংখ্যালঘু। এই কর্মসূচি STEM-এ নারীদের দৃশ্যমানতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।”

তিনি আরও বলেন, “মেয়েরা যদি ছোট বয়স থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে এ ক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবে। ওয়েস্টার্ন সিডনির জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।”
ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি এর আগে ওয়েস্টমিড, ক্যামডেন ও কোবিটিতে প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং STEM শিক্ষায় আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর মার্ক স্কট বলেছেন, “এই অনুদান সিডনি ইউনিভার্সিটির ২০৩২ সালের স্ট্র্যাটেজির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ওয়েস্টার্ন সিডনির শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের STEM বিষয়ে ধারণা বদলানো সম্ভব হবে। এটি হবে একটি মাইলফলক কর্মসূচি, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য উপকারী হবে।”























