
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল এবং রোমানিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা কাজের জন্য যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের এই দেশগুলোতে কর্মসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এই সংকটের কারণে ভুগছেন। এই প্রতিবেদনে আমরা ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের চাকরি পরিস্থিতি ও এর পিছনে থাকা বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করবো।
ইতালিতে কর্মসংকট
ইতালি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কৃষি, রেস্টুরেন্ট, এবং নির্মাণ খাতে বাংলাদেশিরা কাজ করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালির অর্থনৈতিক মন্দা এবং কোভিড-১৯ মহামারির পর চাকরির বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
ইতালির ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স ইন্সটিটিউট (ISTAT) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইতালির বেকারত্বের হার ছিল ৯.৫%। প্রবাসী কর্মীদের জন্য, বিশেষ করে অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশি প্রবাসীরা প্রায়শই অস্থায়ী এবং কম বেতনের কাজে নিযুক্ত থাকেন, যা তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
পোল্যান্ডে চাকরি সংকট
পোল্যান্ডে নির্মাণ ও কৃষি খাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশগুলোর মতো পোল্যান্ডেও অর্থনৈতিক সংকট এবং শ্রম বাজারের চাহিদার পরিবর্তন বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
পোল্যান্ডের বেকারত্বের হার ২০২৩ সালের শেষে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৩%। তবে, অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে চাকরি হারানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া, ভাষাগত দক্ষতা না থাকায় অনেক প্রবাসী স্থানীয় চাকরি বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
পর্তুগালে প্রবাসীদের কাজের অবস্থা
পর্তুগাল সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণ, পরিষেবা এবং কৃষি খাতে বাংলাদেশিরা কাজ করছেন। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলমান মন্দা এবং দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদার কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই চাকরি সংকটে পড়ছেন।
পর্তুগালের বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ৬.৮%, যা ইঙ্গিত দেয় যে শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে, প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে যারা দক্ষ শ্রমিক নন তাদের জন্য কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোমানিয়ায় প্রবাসীদের কর্মসংকট
রোমানিয়া বাংলাদেশের অদক্ষ ও অল্প দক্ষ শ্রমিকদের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু রোমানিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং কর্মসংস্থান নীতির পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীরা কর্মসংকটে ভুগছেন।
রোমানিয়ার বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ছিল ৫.৬%। এছাড়া, বাংলাদেশি প্রবাসীরা অনেক সময় কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং চাকরি নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রবাসীদের জন্য কর্মসংকটের কারণ:
১. অর্থনৈতিক মন্দা:
ইউরোপীয় দেশগুলোতে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং কোভিড-১৯ এর প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে, যা বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মসংকটের একটি বড় কারণ।
২. দক্ষতা এবং ভাষাগত সমস্যা:
বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকেই ইউরোপের দেশগুলোর স্থানীয় ভাষায় দক্ষ নন। ভাষাগত দক্ষতার অভাবে এবং অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষতার কারণে স্থানীয় শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন।
৩. অস্থায়ী চুক্তির কাজ:
বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন। ফলে তাদের চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা বেশি থাকে।
৪. কর্মী অধিকারের অভাব:
অনেক প্রবাসী কর্মী সঠিক শ্রম অধিকার সম্পর্কে অবগত না থাকায় তারা প্রায়শই শোষণের শিকার হন। বিশেষ করে নিম্ন বেতনের কাজ এবং কর্মঘণ্টার সমস্যা তাদের জীবনে কঠিন প্রভাব ফেলে।
চাকরি সংকট মোকাবেলার জন্য কিছু করণীয়:
১. ভাষা শিখুন:
যারা ইউরোপে প্রবাসী হয়ে যেতে চান, তাদের উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা। এটি কর্মসংস্থান পাওয়া এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. দক্ষতা বৃদ্ধি করুন:
অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ কাজের পরিবর্তে, বাংলাদেশের প্রবাসীদের উচিত বিভিন্ন কারিগরি বা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর চাকরি বাজারে সহায়ক হবে।
৩. স্থানীয় কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ রাখুন:
যারা প্রবাসী হিসেবে ইউরোপে রয়েছেন, তাদের উচিত স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সাথে যুক্ত হওয়া। এটি কাজের সুযোগ এবং অন্যান্য সহায়তা পেতে সহায়ক হতে পারে।
ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল এবং রোমানিয়া সহ ইউরোপের অনেক দেশেই বাংলাদেশি প্রবাসীরা কর্মসংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। অর্থনৈতিক মন্দা, দক্ষতার অভাব এবং অস্থায়ী কাজের চুক্তি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে সঠিক প্রস্তুতি, ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবাসীরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেন এবং ইউরোপে একটি সফল কর্মজীবন গড়ে তুলতে পারেন।























