Google search engine

জাপানের মানুষের দীর্ঘায়ু ও উচ্চ আত্মহত্যার হার: রহস্যময় বৈপরীত্য

জাপান দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘায়ু জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটির মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে প্রায় ৮৪ বছর। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘায়ুর দেশটিতেই আত্মহত্যার হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। কেন এমন বৈপরীত্য? এটি বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে জাপানের জীবনধারা, সমাজব্যবস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দিকে।

জাপানের মানুষের দীর্ঘায়ুর পেছনে বেশ কিছু উপাদান কাজ করে। এর মধ্যে প্রধান কিছু কারণ হলো:

১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

জাপানের খাবারের মূল উপাদান মাছ, শাকসবজি, সয়া, সমুদ্রজাত খাবার ও সুষম ডায়েট। স্যামন, টুনা এবং অন্যান্য ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক, যা দীর্ঘায়ুর একটি বড় কারণ।

The Powerful Influence of Japanese Cuisine on Food Culture

২. অ্যাক্টিভ লাইফস্টাইল

জাপানের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে যাতায়াতের জন্য সাইকেল এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবহার স্বাস্থ্যকর শারীরিক কার্যকলাপের একটি বড় অংশ। এর পাশাপাশি মার্শাল আর্ট, যোগব্যায়াম এবং Ai Chi-এর মতো শারীরিক অনুশীলনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।

৩. উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা

জাপানে অত্যন্ত উন্নত এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের সরকার স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা প্রচার করে। এছাড়া, জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা অনেকাংশে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়, যা দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করে।

৪. সামাজিক সহমর্মিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

জাপানের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক। প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবারের সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি যত্নের সুযোগও রয়েছে।

জাপানে আত্মহত্যার হার বেশি কেন?

যদিও জাপানের মানুষের আয়ু বেশি, তবে আত্মহত্যার হারও বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১০০,০০০ জনে জাপানে আত্মহত্যার হার ১৪.৯, যা পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এই বৈপরীত্যের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

১. উচ্চ মানসিক চাপ ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ

জাপানে কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ব্যাপক। ‘করোশি’ (অতিরিক্ত কাজের ফলে মৃত্যু) শব্দটি জাপানেই উদ্ভাবিত। কর্মজীবনে অমানবিক চাপ এবং বিশ্রামের অভাবে অনেকেই হতাশায় ভোগেন, যা আত্মহত্যার মূল কারণগুলোর একটি।

Preventing karoshi or overwork in Japan | W-T-W.org

২. সমাজের চাপ ও প্রত্যাশা

জাপানে সামাজিক দায়িত্ব, সম্মান এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, যদি তারা সমাজ বা পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারেন, তবে তারা সম্মান হারাবেন। এই চাপ থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে।

৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব

যদিও জাপানে শারীরিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা অনেকটা নিষিদ্ধের মতো। ফলে অনেকেই মানসিক অবসাদ ও হতাশার জন্য সঠিক চিকিৎসা পান না।

৪. জীবনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন

দীর্ঘায়ু পাওয়া সত্ত্বেও, অনেক প্রবীণ ব্যক্তি একাকীত্বে ভোগেন। জাপানে জন্মহার কম হওয়ায় পরিবার ছোট, অনেক প্রবীণদের সন্তান বা পরিবার নেই। ফলে জীবন নিয়ে অর্থহীনতার অনুভূতি জন্ম নেয়, যা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

Japan's Elderly Gainfully Employed | Financial Tribune

আত্মহত্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ

জাপান সরকার গত কয়েক দশক ধরে আত্মহত্যা প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রের চাপ কমানোর উদ্যোগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি, এবং হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য সচেতনতা কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আত্মহত্যার হার কিছুটা কমলেও এটি এখনও জাপানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জাপানের দীর্ঘায়ুর পেছনে যেমন রয়েছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অ্যাক্টিভ লাইফস্টাইল এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, তেমনি সমাজের কিছু নিগূঢ় সমস্যা আত্মহত্যার উচ্চ হারের জন্য দায়ী। তাই শুধু দীর্ঘায়ু বা উন্নত স্বাস্থ্যসেবাই আত্মতৃপ্তির কারণ নয়; মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন ও সচেতনতা না বাড়ালে সমাজের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

More articles

Latest